শুক্রবার, ৩০ জুলাই ২০২১, ১১:১৪ পূর্বাহ্ন

আমার নাম তিস্তা আমার জন্ম ভারতের সিকিম রাজ্যেয় আমি এসেছি বাংলাদেশে

মিজানুর রহমান মিজান,লালমনিরহাট
  • সময় কাল : মঙ্গলবার, ২২ ডিসেম্বর, ২০২০
  • ৪২ বার পড়া হয়েছে

মিজানুর রহমান মিজান,লালমনিরহাট

আমি তিস্তা। তিস্তা নদী। আমাকে দিস্তাং, স্যাংচু, রঙ্গ, তৃষ্ণা বলেও জেনেছে অনেকে। কেউ কেউ মনে করে ত্রি ‘সেরাতা’ বা তিন প্রবাহের (করতোয়া, আত্রাই, পুনর্ভবা) জন্যই আমার নাম তিস্তা। ভারতের সিকিম রাজ্যের চুনটাংডে ও লাচুংচুর সঙ্গমে জন্ম আমার। বাংপো, কালিমপং, জলপাইগুড়ি ও মেখলিগঞ্জ পার হয়ে আমি এসেছি বাংলাদেশে। আমি ওপারে নেপাল ও আসামের সীমান্ত দিয়ে হিমালয়কেও ভাগ করেছি। তাই ওখানে আমার নাম তিস্তাং।

তারপর নীলফামারী, লালমনিরহাট ও রংপুর হয়ে কুড়িগ্রামের চিলমারীতে ব্রহ্মপুত্রে নদে মিলেছি। আমার উৎপত্তির কথা উল্লেখ আছে পুরাণ কাহিনীর সঙ্গে। দেবী পার্বতীর বক্ষ থেকে নেমে এসেছি সে কথাও বলে কেউ কেউ।

আমার জন্ম, বয়ে চলা, সুখ-দুঃখ-কষ্ট নিয়ে রয়েছে কত গল্পগাথা, মিথ, কবিতা, গান। তোমরা আমাকে বেণিসদৃশ বারোমাসি নদী হিসেবে চেনো। এক সময় আমাকে উপজীব্য করতে, কত রকম মাছ পেতে আমার বুকে পানসি, গয়লা, টাপুর ভিঙি নিয়ে ভেসে বেড়াতে। এখন তো আর তা সম্ভব নয়। তা হবেই বা কেন? ওপারে (ভারতের গজালডোবা নামক স্থানে) নির্মিত তিস্তা বাঁধ আমাকে বন্দি করে রেখেছে।

এখন প্রায়ই আমি রক্তশূন্য সরীসৃপ। আমার বুকটা এখন ধু-ধু মরুভূমি হয়ে থাকে। তাই তোমরা এখন বলো তিস্তার চর, চর চল্লিশ সাল, চর লক্ষ্মীটারী, বিনবিনার চর, চর সংকরদহ, চর ইচলী, চর বাগডোহরা ইত্যাদি। আর আগে পুনর্ভবা, আত্রাই, করতোয়া, যমুনেশ্বরী, ঘাঘট, সতী স্বর্ণমতী, ভাটেশ্বরী এমন অনেক প্রবাহই ছিল আমার ঔরসজাত। নদী নাকি চিরযৌবনা। সেই ভাগ্যের শিকে ছিঁড়েছে আমার। তোমরা এখন আমার বুকচিরে আলু, বাদাম, তামাক, কুমড়া নানা রকম শস্য ফলাও। এখন আমার দু’পাশে বিস্তীর্ণ ধু-ধু বালুচর। আমার দু’পারের মানুষকে নিয়ে গল্প লেখ; ছবি তুলে টিভিতে দেখাও।

পত্রিকায় ছাপাও। সারা বছর সেমিনা ও মানববন্ধন কর। আমি অপেক্ষায় থাকি। এই বুঝি মরা তিস্তা, বুড়ি তিস্তা, তিস্তার চর নামের কলঙ্ক ঘুচবে। সে আশায় গুড়েবালি। বর্ষা আসে। স্বস্তি পাই। বুক ভরে যায় জলে। শুস্ক উঁচু বুকে বর্ষার জলের সবটুকুই নিতে পারি না। তখন দু’পাশে তোমরা পড়ো বিপাকে। তোমাদের টেনে নেই। আমি তখন হয়ে যাই সর্বনাশী, সর্বগ্রাসী তিস্তা।

আশপাশের মানুষ দুঃখ-দুর্দশায় পড়ে থাকে। আমার বড্ড জ্বালা। বর্ষাকালে যাই ডুবে অন্য সময়ে থাকি শুকিয়ে। দাপুটে তিস্তার যৌবন আজ পড়ন্ত। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ির গজালডোবায় নির্মিত বাঁধ দিয়ে ভারত শুস্ক মৌসুমে ১,৫০০ ঘন/মি. সেকেন্ড পানি মহানন্দা নদীতে নিয়ে যায়। ফলে তোমাদের স্বপ্ন, আশা আমার চরে আটকা পড়ে যাচ্ছে। আগে তোমরা শুধু আমাকেই দেখতে আসতে। আমার সৌন্দর্যে বিমুগ্ধ হতে। এখন আমার ওপরে নির্মিত রংপুরের কাউনিয়া তিস্তা সেতু/রেলসেতু, ডালিয়ার তিস্তা ব্যারাজ, রংপুরে গঙ্গাচড়া মহীপুরে শেখ হাসিনা তিস্তা সেতু দেখতে আসো। আমি তিস্তা, তোমাদের উপকারে আসতে চাই।

এ অঞ্চলের মানুষের স্বপ্ন-আশা পূরণ করতে চাই। তোমাদের সুখ-দুঃখে সর্বদা পাশে থাকতে চাই। আমার বুকে তোমাদের আনন্দচিত্ত আবার জাগ্রত হোক। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশ সরকার মুজিব শতবর্ষে দেশের উত্তরাঞ্চলের তিস্তা নদী ঘিরে উন্নয়নের মহাপরিকল্পনা গ্রহনের মাধ্যমে তা বাস্তবায়ন করে এ অঞ্চলের মানুষকে উপহার দিতে চান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, প্রায় আট হাজার দুইশত কোটি টাকা ব্যয়ে তিস্তার উন্নয়নের এই পরিকল্পনা গ্রহন করছে সরকার। চীন সরকারের এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিনিয়োগ করবে। এ প্রকল্পের আওতায় তিস্তা নদীর দুই পাড়ে ২২০ কিলোমিটার গাইড বাঁধ নির্মাণ করা হবে। বাঁধের দুই পাশে থাকবে সমুদ্র সৈকতের মতো মেরিন ড্রাইভ; যাতে পর্যটকরা লং ড্রাইভে যেতে পারেন। এছাড়া এই রাস্তা দিয়ে পণ্য পরিবহন করাও যাবে।

নদীর দুই ধারে গড়ে তোলা হবে হোটেল, মোটেল, রেস্টুরেন্ট ও পর্যটন নগরী ছাড়াও গড়ে তোলা হবে আধুনিক পরিকল্পিত শহর, নগর ও বন্দর । তিস্তার দুই পাড় হবে সুইজারল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরের মতো সুন্দর নগরী। এ ছাড়া এপ্রকল্পে দেড় শ’ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুত কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। গড়ে উঠবে আধুনিক সেচ সেবা ও আধুনিক যন্ত্রপাতিসমৃদ্ধ কৃষি খামার সহ নৌপথ চালু করা হবে। এই প্রকল্পের সংবাদ নিশ্চিত করেছে লালমনিরহাট জেলা প্রশাসন।

Spread the love
  •  
  •  
  •  

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ বিভাগের আরও খবর
themesba-lates1749691102