শুক্রবার, ১৪ মে ২০২১, ০১:১৮ অপরাহ্ন

এক ছবিতেই সমালোচনার ঝড়!

রাশেদুল ইসলাম রাশেদ, স্টাফ রিপোর্টার:
  • সময় কাল : রবিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২১
  • ৬৪ বার পড়া হয়েছে

রশি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে লোকটির কোমর। হাতে যথারীতি হাতকড়া। সেই হাতকড়ার অন্য মাথাটি সচেতনভাবে ধরে রেখেছেন এক বিজিবি সদস্য। পাশে আরও দুই বিজিবি সদস্য। তারাও প্রস্তুত। ভারী মেশিনগান তাক করে রেখেছেন লোকটির দিকে। এতটুকু শুনে যে কারও মনে হতে পারে, এ নিশ্চয় ভয়ানক কোনো জঙ্গি। নতুবা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী চক্রের দুর্ধর্ষ কোনো খুনি বা এমন কিছু। না। তা নয়। তার সামনের যে টেবিল সেই টেবিলে শোভা পাচ্ছে তার সব অপরাধের সাক্ষী। এক বোতল ফেনসিডিল। এটি নাকি উদ্ধার করা হয়েছে আসামির কাছ থেকে। আর এ জন্যই এত আয়োজন। এ আয়োজনের রীতিমতো ফটোসেশনও হয়েছে। সেই ফটোসেশনের ফটো নিয়েই এখন বইছে সমালোচনার ঝড়। তদুপরি তিনি একজন কলেজ শিক্ষক। পাশাপাশি একজন সিনিয়র সাংবাদিকও। দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসস ছাড়াও দৈনিক জনকণ্ঠের লালমনিরহাট প্রতিনিধি। তিনি জাহাঙ্গীর আলম।যদিও জাহাঙ্গীর আলমের দাবী ফেনসিডিল দিয়ে ফাঁসানো বিজিবির ষড়যন্ত্র।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যে কোনো ব্যক্তিকে এভাবে উপস্থাপন বেআইনি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মানবাধিকার ও সাংবিধানিক অধিকারের লঙ্ঘন। এক বোতল ফেনসিডিলসহ সাংবাদিক জাহাঙ্গীর আলমকে এভাবে উপস্থাপন করা আইনসঙ্গত হয়নি। তারা আরও বলেন, আসলেই এক বোতল ফেনসিডিলসহ তিনি গ্রেপ্তার হয়েছেন কিনা, তিনি অপরাধী কিনা সেটা বিচার্য বিষয়। তবে তার অপরাধের বিচারের আগেই গত দু’দিন ধরে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জাহাঙ্গীর আলমের যে ছবি ভেসে বেড়াচ্ছে তা তার জন্য মর্যাদাহানিকর, মানহানিকর। যদিও জাহাঙ্গীর আলমকে শুক্রবারই জামিন দিয়েছেন আদালত।

জানতে চাওয়া হলে আইন বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক সংবিধানের ৩৫(৫) অনুচ্ছেদ তুলে ধরে বলেন, সে সাংবাদিক, শিক্ষক যেই হোক না কেন, আটকের পর কারও সঙ্গে অমানবিক, নিষ্ঠুর আচরণও করা যাবে না। কিন্তু জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে যেটা করা হয়েছে সেটা লাঞ্ছনাকর ব্যবহার। তবে ক্ষেত্রবিশেষ, যেমন কোনো দাগি সন্ত্রাসী হলে, বেঁধে না রাখলে সমাজের জন্য বিপদের কারণ হতে পারে বা পালিয়ে যেতে পারে, সে ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হতে পারে। কিন্তু এখানে একজন সাংবাদিক ও কলেজ শিক্ষকের সঙ্গে এক বোতল ফেনসিডিলের ব্যাপারে এটা নিঃসন্দেহে প্রতিহিংসা পরায়ণ, লাঞ্ছনাকর আচরণ। তিনি বলেন, ওই ব্যক্তি এখনো আইনের চোখে নির্দোষ। বিচারে অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তকে অপরাধী বলা যাবে না। এ ধরনের আচরণ করে প্রচলিত আইন ও সাংবিধানিক অধিকারের লঙ্ঘন করা হয়েছে।

(১ম অংশ)

গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার রাতে লালমনিরহাট-১৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের কুলাঘাট ক্যাম্পের টহল দল জাহাঙ্গীর আলম শাহীনের কাছ থেকে এক বোতল ফেনসিডিল উদ্ধারের দাবি করে। জাহাঙ্গীরের দাবি, ‘ফেসবুকে গরু পাচার নিয়ে গত ২৫ মার্চ একটি পোস্ট দিই। এ ঘটনায় বিজিবির একজনকে শাস্তি দেওয়া হয়। এর পর থেকে আমাকে হুমকি-ধমকি দিয়ে আসছিল বিজিবি থেকে। বিষয়টি বিজিবির এখানকার প্রধান নির্বাহী (সিইও) লে. কর্নেল তৌহিদুল আলমকে জানায়। এরই মধ্যে বৃহস্পতিবার আমাকে শত্রুতামূলকভাবে ফাঁসিয়ে রাতভর ক্যাম্পে নির্যাতন করেছে। আমার সঙ্গে যে ছিল তাকেও নির্যাতন করে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ছেড়ে দেয়।’ তিনি আরও বলেন, যে ছবিটা ভাইরাল হয়েছে সেটা ক্যাম্পের ভেতরে বিজিবি সদস্যরাই তুলেছেন। এ ছবি তোলার কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেটা ভাইরাল হতে শুরু করে। আমি এ ঘটনার বিচার চাই।’

অবশ্য নির্যাতনের খবর অস্বীকার করে কুলাঘাট বিজিবি ক্যাম্পের ইনচার্জ হাবিলদার আনোয়ার হোসেন বলেছেন, ‘আমরা টহল দিচ্ছিলাম। এ সময় জাহাঙ্গীর আলম মোটরসাইকেলে লালমনিরহাট শহরে যাচ্ছিলেন। এর পর তাকে সার্চ করে এক বোতল ফেনসিডিল পাই। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে তাকে লালমনিরহাট সদর থানায় সোপর্দ করা হয়েছে। এ ঘটনায় থানায় মামলা করা হয়েছে।’ ছবি প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, এ ছবি আমরা উঠাইনি। ছবিটা থানার ভেতরের। সাংবাদিকরা উঠিয়েছে। এর পর কীভাবে ভাইরাল হয়েছে তা আর আমরা জানি না।

এদিকে জাহাঙ্গীর আলমের হাতে হাতকড়া ও কোমরে দড়ি বাঁধার ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর সেখানে বইছে নানা সমালোচনার ঝড়। ওই ছবিসহ বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আলাউদ্দিন আরিফ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে বলেছেন, ‘সত্যিই এক বোতল ফেনসিডিল পাওয়া গেছে তার কাছে, নাকি ফেনসিডিল দিয়ে ফাঁসিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর পাওয়া গেলেও তাকে এভাবে কোমরে দড়ি বেঁধে হাতে হাতকড়া পরানো হলো এর মানে কি? এখানে কি বিজিবির অতি উৎসাহী ভাব পরিলক্ষিত হয় না? তার পরও করিৎকর্মা বিজিবিকে ধন্যবাদ না দিয়ে পারলাম না একজন অপরাধীকে আইনের আওতায় আনার জন্য। তবে এক বোতল ফেনসিডিল আদৌ সাংবাদিক শাহীনের কাছে পাওয়া গেছে নাকি তাকে ফাঁসানো হয়েছে আমি ব্যক্তিগতভাবে ঘটনাটির বিচারবিভাগীয় তদন্ত দাবি করছি।’

এদিকে জাহাঙ্গীর আলম শাহীনকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যা প্রচলিত আইন ও হাইকোর্টের নির্দেশনার লঙ্ঘন। হাইকোর্টের একাধিক নির্দেশনায় বলা আছে, আটকের পরপরই কাউকে গণমাধ্যমের সামনে উপস্থাপন করা যাবে না। সর্বশেষ বরগুনার আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলার আসামি মিন্নিকে গ্রেপ্তারের পর গণমাধ্যমের সামনে উপস্থাপন করা নিয়ে হাইকোর্টের বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ কিছু পর্যবেক্ষণ দেন। ২০১৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর দেওয়া ওই রায়ে বলা হয়, ইদানীং প্রায়ই লক্ষ করা যায়, বিভিন্ন আলোচিত অপরাধের তদন্ত চলার সময় পুলিশ-র‌্যাবসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্ট আদালতে হাজির করার আগেই গণমাধ্যমের সামনে উপস্থাপন করা হয়, যা অনেক সময় মানবাধিকারের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে অমর্যাদাকর এবং অ-অনুমোদনযোগ্য। আমাদের সবাইকে স্মরণ রাখতে হবে, যতক্ষণ পর্যন্ত অভিযুক্ত বিচার প্রক্রিয়া শেষে সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে দোষী সাব্যস্ত না হচ্ছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত চূড়ান্তভাবে বলা যাবে না যে তিনি প্রকৃত অপরাধী বা তার দ্বারাই অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। গণমাধ্যমের সামনে গ্রেপ্তার কোনো ব্যক্তিকে এমনভাবে উপস্থাপন করা সঙ্গত নয় যে, তার মর্যাদা ও সম্মানহানি হয়।’ এ ছাড়া ২০১২ এবং ২০১৫ সালেও হাইকোর্টের পৃথক দুটি বেঞ্চ থেকে একই ধরনের পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়। আইনজীবীরা বলছেন, গ্রেপ্তারের পরপরই একজনকে গণমাধ্যমের সামনে হাজির করা হলে অপরাধ প্রমাণের আগেই তার ব্যক্তি স্বাধীনতা, ব্যক্তি মর্যাদারহানি ঘটে। বিচারে ওই ব্যক্তি নির্দোষ প্রমাণিত হলে তার এ ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়া যায় না। এ কারণেই ব্যক্তির ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার সংবিধানে সংরক্ষণ করা হয়েছে।

 

Spread the love
  •  
  •  
  •  

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ বিভাগের আরও খবর
themesba-lates1749691102