মঙ্গলবার, ২৭ জুলাই ২০২১, ০৯:১৫ অপরাহ্ন

পুঁথি গবেষক আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদের ৬৭ তম মৃত্যু বাষিকী পালিত

Reportar Name
  • সময় কাল : বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর, ২০২০
  • ১০২ বার পড়া হয়েছে
সেলিম চৌধুরী স্টাফ রিপোর্টারঃ
বাংলা  সাহিত্যের অমর পুথিঁ গবেষক মুন্সি আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদের ৬৭ তম  মৃত্যু বার্ষিকী পালিত হয়েছে ।  গতকাল বুধবার বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে সাহিত্য বিশারদ স্মৃতি সংসদের উদ্যোগে রাজনীতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দরা তার স্মৃতি সৌধে  পুষ্পমাল্য অর্পন করার পরেই। সাহিত্য বিশারদ স্মৃতি সংসদ প্রাঙ্গনে খতমে কোরআন ও মিলাদ মাহফিল স্মরণ সভা অনুষ্ঠিত হয় । এ  দিনে ১৮৭১ সালে ১১ অক্টোবর পটিয়ার ঐতিহ্যবাহী সুচক্রদন্ডী গ্রামে  জন্মগ্রহন ও ১৯৫৩ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেন তিনি।
প্রতি বছরের ন্যায় এ বছরও নানান কর্মসূচির মধ্য দিয়ে   সাহিত্য  বিশারদ স্মৃতি সংসদের প্রতিষ্ঠাতা  মুহাম্মদ   ছৈয়দ চেয়ারম্যান, সংসদের সভাপতি মো. সাইফুল্লাহ পলাশ, সাধারণ সম্পাদক বাবলু চৌধুরীর নেতৃত্বে এ দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করা হয়েছে। উল্লেখ্য, সাহিত্য বিশারদ  আবদুল করিম ১৮৬৯, মতান্তরে ১৮৭১ সালের ১১ অক্টোবর পটিয়া মহকুমার সুচক্রদন্ডী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মুনশী নুরউদ্দীন। তার মাতা মিস্রীজান প্রখ্যাত পাঠান তরফদার দৌলত হামজা বংশের মেয়ে ।
জন্মের কয়েক মাস আগে তার বাবার  মৃত্যু ও ১৭ বছর বয়সে মাতৃহীন আবদুল করিম দাদা-দাদি ও চাচা-চাচির স্নেহ ছায়ায় এন্ট্রান্স পাস করেন।  সচেষ্টায় বাংলা, সাংস্কৃত, আরবি ও ফারসি ভাষায় ব্যুৎপত্তি লাভ করে।  পড়াশোনা শুরু হয়েছিল বাড়ির দেউরিতে। সেখানেই তিনি আরবি-ফারসি ও বাংলায় পড়া শুরু করেন। অতঃপর তিনি সুচক্রদন্ডী মধ্যবঙ্গ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। এক বছর পড়াশোনার  পর  পটিয়া উর্চ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৮৯৩ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হন। এন্ট্রান্স পরীক্ষায় তার দ্বিতীয় ভাষা ছিল সাংস্কৃত,  সঙ্গত কারণে উনিশ শতকে এন্ট্রান্স পাস করতে ইংরেজি ভাষা  জ্ঞানেও পারদর্শী।
চট্টগ্রাম কলেজে দু’বছর এফএ পড়ার পর ১৮৯৭ সালের ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রায় পরিবারের মতো তাদের পরিবারেও অর্থনৈতিক অসচ্ছল ও আর্থিক অবস্থা  চরম পর্য্যায়ে কিন্তু পরীক্ষার আগেই  টাইফয়েড জ্বরে  আক্রান্ত হন। ফলে তার আর এফ এ পরীক্ষা দেয়া হয়নি। তার আর  উচ্চ শিক্ষার আশার আলো পুরন  হয়নি। তিনি  বাল্যকাল থেকে পুঁথি পত্রের  খুবই আগ্রহী। সারা জীবন তার নেশা ছিল দৈনিক-সাপ্তাহিক-পাক্ষি-মাসিক বই পুস্তক, কাহিনি  সহ নানান  পত্রিকা পাঠ ও সংগ্রহ।
তাঁর পিতামহ কর্তৃক সংগৃহীত পুঁথির সঙ্গে পরিচিত হন। পুঁথি গুলো পড়ে  পুঁথি সংগ্রহ ও  লিখতে আগ্রহী পুঁথির  মধ্যেই  ‘চন্ডী দাসের পদাবলী’ সহ নানান পদাবলী।  সে সময়ে  এফ এ ক্লাসের ছাত্র। আচার্য অক্ষয় সরকার সম্পাদিত ‘পূর্ণিমা’ পত্রিকায় ‘প্রাচীন পদাবলীর একটি প্রবন্ধ লেখেন। এ প্রবন্ধ পাঠ করেই মহাকবি নবীন চন্দ্র সেন সাহিত্য বিশারদের প্রতি আকৃষ্ট হন। ১৮৯৫ সালে চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল স্কুলের শিক্ষক হিসাবে কর্ম  জীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে  সীতাকুন্ড মধ্য ইংরেজি স্কুলের অস্থায়ী প্রধান শিক্ষক হন। চট্টগ্রামে প্রথম সাব-জজ আদালতে অ্যাপ্রেন্টিস হিসেবে কাজ করেন। পরে কবি নবীন সেনের সুপারিশে চট্টগ্রাম কমিশনার অফিসে যোগদান করেন।
১৯৩৪ সালে তিনি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন।তিনি আর্চায্য জনক  ব্যক্তি,  আজীবন প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের  বাঙালি লেখকেরা যখন পাশ্চাত্য সাহিত্যের প্রভাবে ও অনুরাগে আধুনিক বাংলা সাহিত্য সৃষ্টিতে নিজেরা  নিয়োজিত হন তখন  প্রাচীন ও মধ্যযুগের পুঁথি সংগ্রহ, পুঁথির রণাবেণ ও পুঁথি সম্পাদনায় নিজেকে নিয়োজিত ছিলেন । মূলত পুঁথি সংগ্রহ, পুঁথির রণাবেণ ও পুঁথি সম্পাদন ছিল তার জীবনের ব্রত। বর্ণাঢ্য জীবনে তিনি বাংলা সাহিত্যের প্রধান উপাদান পুঁথি পত্র ও এ দেশের প্রাচীন ও মধ্য যুগের লৌকজ-সাহিত্যের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছেন।
তাঁর সম্পাদিত নরোত্তম ঠাকুরের ‘রাধিকার মানভঙ্গ’, কবিবল¬ভের ‘সত্যনারায়ণের পুথিঁ’, দ্বিজ রতিদেবের ‘মৃগলুব্ধ’ রামরাজার ‘মৃগলুব্ধ সম্বাদ’, দ্বিজ মাধবের ‘গঙ্গামঙ্গল’, আলী রাজার ‘জ্ঞানসাগর’, বাসুদেব ঘোষের ‘শ্রীগৌরাঙ্গ সন্ন্যাস’, মুক্তারাম সেনের ‘সারদামঙ্গল’, শেখ ফয়জুল¬াহর ‘গোরক্ষবিজয়’ ও আলাওলের ‘পদ্মাবতী’ (খণ্ডাংশ) বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ থেকে প্রকাশিত। ‘ইসলামাবাদ’ (চট্টগ্রামের সচিত্র ইতিহাস) ও ‘আরাকান রাজসভায় বাঙ্গলা সাহিত্য’ (মুহম্মদ এনামুল হকের সহযোগে রচিত) তাঁর দুটি মৌলিক গ্রন্থ। উনিশ-বিশ শতকের রেনেসাঁর মানস  পুত্রদের একজন। তার সময়ে খাঁটি বাঙালির সংখ্যা কমই ছিল। তাঁর সময়ে উপমহা দেশের রাজনীতি ও সংস্কৃতি সাম্প্রদায়িক চেতনায়, ওই পঙ্কিল স্রোত কলুষিত করতে পারেনি।
নিরলস সাহিত্য-সাধনার স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯০৯ সালে চট্টল ধর্মমণ্ডলী কর্তৃক ‘সাহিত্য বিশারদ’ উপাধি এবং ১৯২০ সালে নদীয়ার সাহিত্য সভার কাছ থেকে ‘সাহিত্য সাগর’ উপাধি লাভ। তাকে  যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করতে পারিনি। তা সত্ত্বেও চট্টগ্রাম পৌর সদর তার স্মৃতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে চট্টগ্রামের লাভ লেইন সড়কটির নাম পরিবর্তন করে আব্দুল করিম সাহিত্য  বিশারদ সড়ক নামকরণ করা হয় । দেরীতে হলেও সাহিত্যে অসাধারণ অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৫ সালে তাকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পদক প্রদান ।
বাংলা সাহিত্যের  অতুলনীয় সাহিত্যকর্মী ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দের ৩০ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের নিজ বাসভবনে ‘চট্টগ্রামের অজানা কাহিনী’ লিখতে বসে ১০টা ৪৭ মিনিটে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।মহান সাধকের ৬৭ তম মৃত্যু  বার্ষিকী  দিবসটি  এ দিনে পালিত হয়। এছাড়াও ঢাকা চট্টগ্রাম সহ বিভিন্ন উপজেলা আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদের ৬৭তম মৃত্যু বার্ষিকী পালন করা হয়েছে।
Spread the love
  •  
  •  
  •  

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ বিভাগের আরও খবর
themesba-lates1749691102