রাষ্ট্রপতির প্রেসসচিব মো. জয়নাল আবেদীন কালের কণ্ঠকে জানান, আগামী ২৪ এপ্রিল নতুন রাষ্ট্রপতির শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান শেষে মো. আবদুল হামিদ কিছু আনুষ্ঠানিকতা শেষ করবেন। তারপর তিনি বঙ্গভবন থেকে বিদায় নেবেন। এ সময় তাঁকে গার্ড অব অনার দেওয়া হবে।
রাষ্ট্রপতির প্রেসসচিব মো. জয়নাল আবেদীন কালের কণ্ঠকে জানান, আগামী ২৪ এপ্রিল নতুন রাষ্ট্রপতির শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান শেষে মো. আবদুল হামিদ কিছু আনুষ্ঠানিকতা শেষ করবেন। তারপর তিনি বঙ্গভবন থেকে বিদায় নেবেন। এ সময় তাঁকে গার্ড অব অনার দেওয়া হবে।
গত ১৭ এপ্রিল বঙ্গভবনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পক্ষ থেকে আবদুল হামিদের বিদায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এর আগে ১৬ এপ্রিল সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। বিদায়ি সাক্ষাতের জন্য স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকু ও জাতীয় সংসদের হুইপরা বঙ্গভবনে গিয়েছিলেন ১৩ এপ্রিল। সব শেষ গত ১৮ এপ্রিল তিন বাহিনীর প্রধানরা রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের সঙ্গে বিদায়ি সাক্ষাৎ করেন।
টানা ১০ বছর ৪১ দিন দায়িত্ব পালন : একটানা দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রপতি পদে দায়িত্ব পালনের রেকর্ড রেখে যাচ্ছেন বর্ষীয়ান রাজনীতিক আবদুল হামিদ। একমাত্র তিনিই পুরো দুই মেয়াদ রাষ্ট্রপ্রধানের পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। সংবিধানে উল্লেখ আছে, এক ব্যক্তি দুই মেয়াদের (১০ বছর) বেশি এই পদে থাকতে পারবেন না। নির্বাচিত হওয়ার আগে প্রথমে ভারপ্রাপ্ত ও পরে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে ৪১ দিন দায়িত্ব পালন করেন আবদুল হামিদ।
লেখালেখি করে সময় কাটানোর পরিকল্পনা : রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদ থেকে অবসর গ্রহণের পর নতুন কোনো দায়িত্ব পালন নয়, লেখালেখি করে সময় কাটাবেন বলে জানিয়েছেন মো. আবদুল হামিদ। তাঁর দীর্ঘ ৬৪ বছরের রাজনৈতিক জীবনে বহু সাংবাদিকের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে উঠেছে। বিদায়ের আগে তাঁদের কয়েকজনকে গত ১২ মার্চ বঙ্গভবনে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন তিনি। তাঁদের সঙ্গে গল্পে-আড্ডায় অতীত স্মৃতিচারণার পাশাপাশি অবসর জীবনের কর্মপরিকল্পনার কথা জানান। তিনি জানান, বঙ্গভবন ছেড়ে উঠবেন রাজধানীর নিকুঞ্জে। মাঝে-মধ্যে যাবেন জন্মস্থান মিঠামইন। এ সময় লেখালেখি হবে তাঁর প্রধান কাজ। তিনি বলেন, ‘আমার ভালো লাগছে যে আমি সম্মানজনকভাবে বিদায় নিতে পেরেছি। এ জন্য আমি সবার কাছে কৃতজ্ঞ।’ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদ থেকে অবসরের পর আর কোনো পদ নেওয়া উচিত নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অবসরে পাবেন যেসব সুযোগ-সুবিধা : অবসরে যাওয়ার পর আইন অনুযায়ী অবসর ভাতা, চিকিৎসা সুবিধাসহ অন্য কিছু সুযোগ-সুবিধা পাবেন তিনি। একজন সাবেক রাষ্ট্রপতি কী কী সুবিধা পান, তার উল্লেখ রয়েছে ‘দ্য প্রেসিডেন্টস (রেমিউনারেশন অ্যান্ড প্রিভিলেজেস) অ্যাক্ট-১৯৭৫ (মে ২০১৬ পর্যন্ত সংশোধিত) আইনে। তাতে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি পদে কমপক্ষে ছয় মাস দায়িত্ব পালন শেষে পদত্যাগ করলে অথবা মেয়াদ শেষ হলে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে সর্বশেষ যে মাসিক বেতন পেতেন, তার ৭৫ শতাংশ হারে মাসিক অবসর ভাতা পাবেন। বর্তমানে রাষ্ট্রপতির মাসিক বেতন এক লাখ ২০ হাজার টাকা। সেই হিসাবে অবসরের পর মো. আবদুল হামিদ মাসে ৯০ হাজার টাকা অবসর ভাতা পাবেন।
অবসরে যাওয়ার পর সাবেক রাষ্ট্রপতি হিসেবে আরো কিছু সুযোগ-সুবিধা পাবেন আবদুল হামিদ। তিনি একজন ব্যক্তিগত সহকারী ও একজন অ্যাটেনডেন্ট (সাহায্যকারী) পাবেন। দাপ্তরিক ব্যয়ও পাবেন (সরকার নির্ধারণ করবে)। একজন মন্ত্রীর প্রাপ্য চিকিৎসা সুবিধার সমপরিমাণ চিকিৎসা সুবিধা পাবেন। সরকারি অনুষ্ঠানে যোগদানের জন্য পাবেন সরকারি যানবাহন ব্যবহারের সুবিধা। আবাসস্থলে একটি টেলিফোন সংযোগ পাবেন এবং সরকার নির্ধারিত সীমা পর্যন্ত বিল পরিশোধ করবে। সাবেক রাষ্ট্রপতি হিসেবে একটি কূটনৈতিক পাসপোর্টও পাবেন তিনি। দেশের ভেতর ভ্রমণকালে সরকারি সার্কিট হাউস বা রেস্ট হাউসে অবস্থানের সুবিধা পাবেন। ওই সব সুবিধা আবদুল হামিদের স্ত্রীও পাবেন।
বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্যে রাজনীতির শুরু : জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সান্নিধ্যে রাজনীতি শুরু করেন বিদায়ি রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে রয়েছে তাঁর অসংখ্য স্মৃতি। যার কিছু গত ৭ এপ্রিল জাতীয় সংসদে দেওয়া স্মারক বক্তৃতায় তুলে ধরেন তিনি। তাতে তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর হাতে হয়েছিল আমার রাজনীতির হাতেখড়ি ও প্রথম উত্থান। আর ’৯৬-তে বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে দ্বিতীয় উত্থান ঘটে। ১৯৬৪ সালে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়। আমি তখন কিশোরগঞ্জ গুরুদয়াল কলেজের ছাত্র। পরিচয় থেকেই বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্যে আসা। তারপর বঙ্গবন্ধুর নীতি ও আদর্শের অনুসারী হয়ে যাই। বঙ্গবন্ধুর দিকনির্দেশনায় কিশোরগঞ্জে আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়ে যাই। বঙ্গবন্ধুই ছিলেন আমার একমাত্র ধ্যান-ধারণা। তাঁর নীতি-আদর্শ ও নির্দেশনাই আমার কাছে সবচেয়ে বেশি অনুসরণীয় ও অনুকরণীয় বিষয়। শুধু আমি কেন, ওই সময় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অনেক যুবকের কাছে বঙ্গবন্ধুই ছিলেন একমাত্র আদর্শ।’
আবদুল হামিদ বলেন, ‘১৯৭০ সালে সাধারণ নির্বাচনের দিনক্ষণ এগিয়ে এলে বঙ্গবন্ধু আমাকে ডেকে পাঠান এবং নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়ার কথা জানান। মাত্র ২৫ বছরের একজন যুবককে জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়ার সিদ্ধান্তে সেদিন অনেকে অবাক হয়েছিলেন। আমি নিজেও কম অবাক হইনি। কারণ তখনো আমি ছাত্র।’
তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর প্রচেষ্টায় ১৯৭০ সালে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে সর্বকনিষ্ঠ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হলাম এবং এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭২ সালে গণপরিষদের সদস্য হই। বঙ্গবন্ধুর অপার স্নেহ আর তাঁর দূরদর্শিতার কারণেই আমি আজকের এই অবস্থানে পৌঁছেছি। ১৯৭০ সালে বঙ্গবন্ধু আমাকে মনোনয়ন না দিলে নিভৃত হাওরের আবদুল হামিদ হয়তো বা নিভৃতেই থেকে যেত। তাই রাষ্ট্রপতি হিসেবে নয়, বঙ্গবন্ধুর আদর্শের একজন সৈনিক হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিতেই আমি বেশি গর্ববোধ করি।’
বর্ণাঢ্য ও সংগ্রামমুখর রাজনৈতিক জীবন : বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে যাঁরা দায়িত্ব পালন করেছেন, তাঁদের অনেককে বিতর্কিত হয়ে বঙ্গভবন ছাড়তে হলেও কোনো বিতর্ক স্পর্শ করতে পারেনি মো. আবদুল হামিদকে। তিনি ষাটের দশকে গুরুদয়াল কলেজে ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে নেতৃত্ব দেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তাঁর আদর্শিক বিচ্যুতি বা পদস্খলন নেই। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়ার মায়া ছেড়ে এলাকায় সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন এবং সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। প্রথম সংসদ থেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার আগে সাতবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ছাত্রজীবনে কলেজ ছাত্রসংসদের ভিপি ও জিএস নির্বাচিত হন।
বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অবিচল আবদুল হামিদ পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ে বিভ্রান্ত হননি, আবার এক-এগারোর সরকারের আমলে শেখ হাসিনার পক্ষে অটল থেকেছেন। যে কারণে ১৯৯৬ সালে ডেপুটি স্পিকার পদে মনোনয়ন পান। স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর মৃত্যুর পর স্পিকারের দায়িত্ব নিয়ে সংসদকে প্রাণবন্ত করে তোলেন তিনি।
দায়িত্ব পালনকালে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি সরকার ও বিরোধী দলের প্রশংসা অর্জন করেছেন আবদুল হামিদ।
এই নিউজ পোর্টাল এর কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি ও দণ্ডনীয় অপরাধ।