সংশোধন হচ্ছে গণনা পদ্ধতি

দেশের বার্ষিক রপ্তানির প্রকৃত পরিমাণের চেয়ে ১৪ বিলিয়ন ডলার বেশি দেখানোর ঘটনা বিভিন্ন মহলে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। রপ্তানির মতো গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর একটি খাতকে নিয়ে সরকারি প্রতিষ্ঠানের ভুল তথ্য প্রকাশের এমন ঘটনায় একই সঙ্গে বিস্ময় ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদরা।
এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক রপ্তানি তথ্যের গরমিলের বড় অঙ্ক সামনে আনার পর তথ্য গণনা পদ্ধতি সংশোধনের উদ্যোগ নিতে শুরু করেছে সরকার। এজন্য বিশ্ববাজারে বিক্রির রিয়েল-টাইম তথ্য প্রকাশে একটি প্ল্যাটফর্ম চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে। গত সোমবার রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) এক সভায় লাইভ ডেটা প্ল্যাটফর্ম চালু করার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বৈঠকে ইপিবি, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
দেশের রপ্তানির তথ্য প্রকাশ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)। এ প্রতিষ্ঠানের তথ্যকে উৎস হিসেবে দেখিয়ে রপ্তানি আয়ের তথ্য বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রকাশ করে আসছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংক গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল মেয়াদে দেশের বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্যের (বিওপি-ব্যালেন্স অব পেমেন্ট) তথ্য প্রকাশ করলে রপ্তানির তথ্যে বড় ধরনের গরমিল দেখা দেয়। এরপর হিসাব পদ্ধতি সংশোধন করে রপ্তানি আয় থেকে ১৩ দশমিক ৮০ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৩৮০ কোটি ডলার বাদ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সংশোধনের মাধ্যমে রপ্তানি আয় কমে আসায় দেশের জিডিপির আকার, প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয়সহ এসব সূচকে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এজন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ওপর দায় চাপিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ নিয়ে অর্থ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠিও দিয়েছে তারা।
এদিকে অর্থবছর শেষ হলেও এখনো রপ্তানি আয়ের চূড়ান্ত হিসাব প্রকাশ করেনি কোনো সরকারি সংস্থা। এ নিয়ে নতুন কোনো তথ্যও দেয়া হচ্ছে না। কবে তা জানা যাবে সেটিও কেউ বলছেন না। তবে রপ্তানি আয়ের হিসাবে যে গরমিল দেখা দিয়েছে তার একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান। তিনি গত রবিবার এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) থেকে যে পরিমাণ পণ্য রপ্তানি হয়েছে তা ডবল কাউন্ট (দুবার গণনা করা বা দুবার যোগ করা) করায় তথ্যে গরমিল হয়েছে।
গত সোমবার বৈঠকে অংশ নেয়া ইপিবির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, তথ্যের অমিল নীতিনির্ধারকদের ভুল বার্তা দিচ্ছে বলেই এই প্ল্যাটফর্মের পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে প্ল্যাটফর্মটি কবে চালু হবে এবং কীভাবে চালানো হবে তা তাৎক্ষণিকভাবে বলতে পারেননি তিনি। কারণ পরিকল্পনাটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। এ বিষয়ে শিগগিরই ইপিবি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে অবহিত করবে জানিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, এ ধরনের একটি আধুনিক ডাটা প্ল্যাটফর্ম তৈরির জন্য অর্থের প্রয়োজন হবে। এর আগে, চলতি সপ্তাহের শুরুতে বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী আহসানুল ইসলাম টিটু গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, রিয়েল-টাইম ডেটা প্ল্যাটফর্মের জন্য শিগগিরই নতুন প্রকল্প নেয়া হবে। পরিকল্পিত প্ল্যাটফর্মের আওতায় ইপিবিতে প্রতিদিনের রপ্তানি তথ্য সরবরাহ করবে এনবিআর এবং বাংলাদেশ ব্যাংক রিয়েল-টাইম বিনিময় হারের ভিত্তিতে এটি হিসাব করবে।
ইপিবির এই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, শুল্ক বিভাগ টাকায় রপ্তানি পণ্যের পরিসংখ্যান পাঠায় এবং ইপিবি তা মার্কিন ডলারে রূপান্তর করে। তবে
একটি একক ডেটা প্ল্যাটফর্ম সব ধরনের বিভ্রান্তি দূর করবে, কারণ পরিসংখ্যানগুলো তখন রিয়েল টাইমের ভিত্তিতে সরবরাহ এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে গণনা করা হবে। ইপিবির কর্মকর্তা আরো বলেন, অতীতে প্রকৃত রপ্তানি ও অস্থায়ী রপ্তানি তথ্যের মধ্যে ব্যবধান বার্ষিক ৪ বিলিয়ন ডলারের মতো ছিল। কিন্তু এবার একই পণ্য একাধিকবার গণনার কারণে সেই ব্যবধান বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪ বিলিয়ন ডলারে।
বিদ্যমান রপ্তানি নীতিমালার আওতায়, রপ্তানিকারকরা সম্ভাব্য ক্রেতাদের কাছে বিনামূল্যে কিছু নমুনা পাঠান, এনবিআরের শুল্ক বিভাগ তার মূল্যও গণনা করেছে। এছাড়া গত বছর রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের আওতাধীন কারখানাগুলো দেশের ক্রেতাদের কাছে প্রায় ১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের পণ্য বিক্রি করেছে। বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পণ্য বিক্রির তথ্য গণনার সময় এই পরিসংখ্যানকেও বিবেচনায় নিয়েছে ইপিবি। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক চূড়ান্ত রপ্তানি তথ্যে এই পরিসংখ্যান অন্তর্ভুক্ত করেনি। তিনি জানান, বর্তমানে শুল্ক বিভাগ থেকে রপ্তানি তথ্য পাওয়ার পর ইপিবি তা হিসাব করে। পণ্যদ্রব্যের জাহাজিকরণ বিলের ওপর ভিত্তি করে শুল্ক বিভাগ এসব তথ্য পাঠায়। তবে পণ্য দেশ ছাড়ার পর অনেক পরিবর্তন আসতে পারে। যেমন, কখনো কখনো কিছু পণ্য রপ্তানি করা হয় না। তবে শুল্ক বিভাগ সেই তথ্য বিবেচনা করে ও ইপিবিতে পাঠায়।
সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, এটি সত্যিই একটি ভালো পদক্ষেপ হবে। তিনি ইপিবি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানের গরমিলকে বড় তথ্য কেলেঙ্কারি বলে অভিহিত করেন। সেলিম রায়হান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সায়েমা হক বিদিশা দুজনেই বলেন, সরকারের উচিত আগে তথ্য গরমিলের কারণগুলো খুঁজে বের করা। অধ্যাপক সায়েমা হক বিদিশা বলেন, বাণিজ্য তথ্য যাচাই করার একটি উপায় হলো আমদানিকারকদের দিক থেকে তথ্য যাচাই করা। আবার এটাও গুরুত্বপূর্ণ যে, এই তথ্য নিয়মিতভাবে ইউএন কমট্রেডে রিপোর্ট করা হচ্ছে কিনা। তিনি বলেন, ভুলের উৎস খুঁজে বের করা জরুরি। সেখানে নানা ব্যাখ্যা থাকতে পারে। এটা রপ্তানিকারকদের ওভার ইনভয়েসিং হতে পারে। অথবা ইপিবি ভুল তথ্য রিপোর্ট করতে পারে, কিংবা এমনও হতে পারে রপ্তানি আয়ের একটি অংশ দেশে আনা হয়নি।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, জিডিপিসহ অর্থনীতির অনেকগুলো সূচক নির্ধারণে রপ্তানি আয়ের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়, কাজেই সেগুলো নিয়ে এখন প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়। এমন অবস্থায় জিডিপি, জিএনপি, লেনদেনের ভারসাম্য, বিদেশি ঋণগ্রহণের নীতিসহ অর্থনীতির অনেক সূচক সংশোধন করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে বোঝা যাচ্ছে যে, এসব সূচকগুলো ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করা হয়েছিল। ফলে সেগুলো দিয়ে অর্থনীতির প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে না। এ ধরনের ভুল কারা করল? কেন করল? এটি নিছকই পদ্ধতিগত ভুল, নাকি তার চেয়ে বেশি কিছু? সেটা দেখা জরুরি। তিনি বলেন, এর আড়ালে কেউ বাড়তি সুবিধা বা প্রণোদনা নিয়েছে কিনা, বা টাকা পাচার করেছে কিনা, সেটি খতিয়ে দেখাটাও প্রয়োজন।