বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত বন্ধু জাপান

স্বাধীনতা অর্জনের দুই মাসেরও কম সময়ের মধ্যে ১৯৭২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় জাপান। সেই প্রসঙ্গ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, জাপান বাংলাদেশের দীর্ঘকালের পরীক্ষিত বন্ধু। দেশটিকে বিশ^স্ত উন্নয়ন অংশীদার আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ তার উন্নয়নের জন্য জাপানের অবিচল সমর্থন পেয়েছে এবং স্বাধীনতার পর জাপানের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ সরকারি উন্নয়ন সহায়তা পেয়েছে।’
জাপানের বৃহত্তম ও প্রাচীন ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য জাপান টাইমস’-এ লেখা এক নিবন্ধে এসব কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দেশটিতে প্রধানমন্ত্রীর সফরের দ্বিতীয় দিন গত ২৫ এপ্রিল নিবন্ধটি প্রকাশ করা হয়।
নিবন্ধে প্রধানমন্ত্রী জানান, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ৫১তম বার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে সম্পর্ক জোরালো করতে টোকিও সফর করছেন তিনি। সম্রাট নারুহিতো ও সম্রাজ্ঞী মাসাকের প্রতি
কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পাশাপাশি সফরের আমন্ত্রণ জানানোয় জাপানের প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদাকে ধন্যবাদ জানান শেখ হাসিনা। জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিনি ছিলেন বাংলাদেশের মহান বন্ধু।
মুক্তিযুদ্ধে জাপানের সহায়তার প্রসঙ্গ তুলে ধরে শেখ হাসিনা লিখেছেন, সবচেয়ে অবিস্মরণীয় ঘটনা ছিল জাপানি স্কুলের শিশুরা তাদের টিফিনের টাকা জমা করে সেই টাকা ঘূর্ণিঝড় এবং যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সহায়তার জন্য পাঠিয়েছিল। তিনি বলেন, ‘তার পর থেকে জাপান আমাদের দীর্ঘকালে পরীক্ষিত বন্ধু থেকে গেছে। জাপান আমার হৃদয়ের খুব কাছের একটি দেশ, ঠিক যেমন এটি আমার পরিবার এবং আমাদের জনগণের কাছে।’
১৯৭৩ সালের অক্টোবরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জাপান সফরের সময়ে তার ছোট ভাই শেখ রাসেল ও শেখ রেহানাও ছিলেন বলে জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, জাপানের অমূল্য অভিজ্ঞতা থেকে শিখতে বারবার এখানে আসি। আমি বিশ্বাস করি যে, আমাদের ব্যাপক অংশীদারত্ব থেকে একটি কৌশলগত অংশীদারত্বের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে।’ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাপানকে মডেল হিসেবে অনুসরণ করতে চেয়েছিলেন বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
ঢাকায় মাস র্যাপিড ট্রানজিট ট্রেন (এমআরটি) লাইন, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, ঢাকা বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং আড়াইহাজারে একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ জাপান বাংলাদেশের কয়েকটি বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। এমআরটি লাইন নির্মাণে সংশ্লিষ্ট কয়েক জাপানি বিশেষজ্ঞ ঢাকায় সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হওয়ার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি লেখেন, ‘এটি বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার পর্বগুলোর একটি। আমি অনেক দুঃখের সঙ্গে তাদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করছি এবং আবারও তাদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি।’
গত ১৪ বছরে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অগ্রগতির কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা লেখেন, ‘আমাদের দেশ আর দারিদ্র্যপীড়িত নয়। বরং, এটি এখন উন্নয়নের বিস্ময়কর ঘটনা হিসেবে বিবেচিত। দেড় দশকে মাথাপিছু আয় পাঁচ গুণেরও বেশি বেড়েছে। মানবসম্পদ উন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা, নারীর ক্ষমতায়ন, দারিদ্র্য বিমোচন এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।’
করোনা মহামারীতে বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রভাবিত হয় জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী লেখেন, ‘দুঃখজনক হলো, আমরা যখন মহামারী থেকে পুনরুদ্ধার হচ্ছিলাম, ঠিক তখনই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং পরবর্তী নিষেধাজ্ঞা এবং পাল্টা নিষেধাজ্ঞা আমাদের উন্নয়নের ওপর আঘাত হানে। এর ফলে জ্বালানি, খাদ্য এবং অন্যান্য পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির দিকে পরিচালিত করেছে; সেই সঙ্গে সাপ্লাই চেনের ব্যাঘাত আমাদের মতো দেশগুলোকে ভয়ংকর বিপদের দিকে ঠেলে দেয়।’
ঘূর্র্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব বাংলাদেশের কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতেও সমস্যায় ফেলেছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, সমস্ত বিপদ সত্ত্বেও বাংলাদেশের অর্থনীতি সহনশীল এবং বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগের জন্য একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে রয়ে গেছে। কারণ বাংলাদেশের উদার নীতি ও আইন বিনিয়োগের জন্য অনুকূল এবং উৎসাহজনক।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে অত্যন্ত সৌভাগ্যবান বাংলাদেশ। এটি পশ্চিমে ভারতীয় উপমহাদেশকে, পূর্বে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সংযুক্ত করেছে। প্রায় ১৭ কোটি জনসংখ্যার নিজস্ব অভ্যন্তরীণ বাজার নিয়ে বাংলাদেশের গ্রাহক ভিত্তি ৩ বিলিয়ন। তিনি বলেন, ‘অতএব, এটি ধীরে ধীরে দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের ব্যবসায়িক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। আমাদের উভয় দেশের পারস্পরিক সুবিধার জন্য বাংলাদেশে জাপানিদের আরও বেশি বিনিয়োগ দেখে বাংলাদেশ খুব খুশি হবে।’
রোহিঙ্গা ইস্যু উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন- জাপান, এই অঞ্চলে তার ফলপ্রসূ প্রভাবের মাধ্যমে মধ্যস্থতা করতে পারে এবং এই রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে তাদের স্বদেশে ফিরে যেতে সাহায্য করতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ও জাপান উভয়ই শান্তিপ্রিয় দেশ। বৈশ্বিক শান্তি, স্থিতিশীলতা, টেকসই উন্নয়ন, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি সমুন্নত রাখতে আন্তর্জাতিক ফোরামে সহযোগিতা করছে। শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আমাদের সহযোগিতা এবং বন্ধুত্ব উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাবে এবং সমৃদ্ধ হবে।’