• বৃহস্পতিবার, ২৫ জুলাই ২০২৪, ০৪:২৯ পূর্বাহ্ন

চীনের সঙ্গে সম্পর্কে নতুন দ্বার

Kolomer Batra / ১৪ বার পড়া হয়েছে।
সময় কাল : বৃহস্পতিবার, ১১ জুলাই, ২০২৪

বাংলাদেশের উন্নয়ন-অগ্রযাত্রায় অব্যাহতভাবে সহযোগিতা করে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছে চীন। গতকাল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এ অঙ্গীকার করেন। এর আগে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর ২২টি সমঝোতা স্মারক এবং সাতটি প্রকল্প ঘোষণাপত্র সই করেছে বাংলাদেশ ও চীন।

পাশাপাশি চীনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে ১ বিলিয়ন ইউয়ান সহায়তার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক ‘কৌশলগত অংশীদারি’ থেকে ‘ব্যাপক কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারি’তে উন্নীত হয়েছে বলে জানিয়েছেন কূটনীতিকরা। চীন সফরের তৃতীয় দিন গতকাল সকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বেইজিংয়ের ‘গ্রেট হল অব দ্য পিপল’-এ পৌঁছালে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং তাঁকে স্বাগত জানান। এখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে লালগালিচা সংবর্ধনা ও গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। এ সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভিবাদন জানিয়ে তোপধ্বনি দেওয়া হয়। পরে দুই প্রধানমন্ত্রী সশস্ত্র বাহিনীর প্যারেড পরিদর্শন করেন। শেখ হাসিনাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে অভ্যর্থনা জানানোর পর দুই দেশের প্রতিনিধিদের নিয়ে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসেন দুই প্রধানমন্ত্রী। দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে রোহিঙ্গা ইস্যু ছাড়াও দুই দেশের মধ্যকার ব্যবসাবাণিজ্য, বিনিয়োগ, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক,

সহযোগিতাসহ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। দুই প্রধানমন্ত্রী চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক, ঘোষণাপত্র সই এবং দলিল হস্তান্তর প্রত্যক্ষ করেন। অর্থনৈতিক ও ব্যাংকিং সেক্টরে সহযোগিতা, ব্যবসা-বিনিয়োগ, ডিজিটাল অর্থনীতি, অবকাঠামো উন্নয়ন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সহায়তা, ষষ্ঠ ও নবম বাংলাদেশ-চায়না মৈত্রী সেতু, কৃষিপণ্য রপ্তানি, দুই দেশের জনগণের সঙ্গে জনগণের কানেকটিভিটি সহযোগিতা বিষয়ে এসব চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই এবং দলিল হস্তান্তর হয়। গ্রেট হলে চীনা প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া মধ্যাহ্নভোজে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী। বিকালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন শেখ হাসিনা। সফর শেষে গতকাল সন্ধ্যায় ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন তিনি।

চার ধরনের অর্থনৈতিক সুবিধা ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে দৃঢ় সহায়তার প্রত্যয় : ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফঙ্গ দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক সুবিধার প্যাকেজ ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে দৃঢ় সহায়তা দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।

বৈঠক শেষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বেইজিংয়ের সেন্ট রেজিস হোটেলে সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, বৈঠকে চীনের প্রেসিডেন্ট গ্রান্ট বা সহায়তা, সুদমুক্ত ঋণ, কনসেশনাল বা ছাড়যুক্ত ঋণ ও বাণিজ্যিক ঋণ-এ চার ধরনের অর্থনৈতিক সুবিধার একটি প্যাকেজ দেওয়ার ঘোষণা দেন। চীনের প্রেসিডেন্ট নিজে থেকেই বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গার প্রত্যাবাসনে সর্বোচ্চ সহযোগিতা দেওয়ার কথা বলেন।

তিনি মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সঙ্গে এবং প্রয়োজনে আরাকান সেনা দলের সঙ্গেও কথা বলবেন বলে জানান। পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বৈঠকে শি জিনপিং বলেন, ২০২৫ সালে চীন-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তিতে সম্পর্ক দ্বিতীয় পর্যায়ে উন্নীত করে এ উদ্যাপন অর্থবহ করতে তাঁরা প্রস্তুত। চীনের প্রেসিডেন্ট ‘গুড গভর্ন্যান্স নিডস গুড পার্টি’ বা ‘সুশাসনের জন্য ভালো দল’ মন্তব্য করে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের যোগাযোগ বৃদ্ধি ও বন্ধনের ওপর জোর দেন। পাশাপাশি শি জিনপিং বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণ, কারিগরি, কৃষি ও উৎপাদন খাতে সহায়তা এবং ছাত্রবৃত্তি বৃদ্ধির আশ্বাস দেন।

চীনের প্রেসিডেন্ট বৈঠকে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের উন্নয়নকে অভূতপূর্ব বর্ণনা করেন এবং চীনা সহায়তা অব্যাহত থাকবে বলে জানান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনের জন্য একক বরাদ্দ ৮০০ একর জমিসহ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও আইটি ভিলেজগুলোয় বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশ থেকে পাট ও চামড়াজাত, ফার্মাসিউটিক্যালস, সিরামিক, আম, অন্যান্য ফলসহ পণ্য আমদানি বৃদ্ধির মাধ্যমে বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনার আহ্বান জানালে চীনের প্রেসিডেন্ট ইতিবাচক সাড়া দেন। এর আগে দুপুরে দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক শেষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের জানান, দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শেষে দুই প্রধানমন্ত্রী দুই দেশের মধ্যে ২১টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর প্রত্যক্ষ করেন। এ সময় চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং বাংলাদেশকে ১ বিলিয়ন ইউয়ান সহায়তার ঘোষণা দেন। পরে বেইজিংয়ের সেন্ট রেজিস হোটেলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের উপস্থিতিতে ২২তম সমঝোতা স্মারকটি স্বাক্ষরিত হয়।

যেসব চুক্তি-সমঝোতা স্মারক ও দলিল স্বাক্ষর হলো : ‘কৌশলগত অংশীদারি’ থেকে ‘ব্যাপক কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারি’তে উন্নীত হতে ২২টি সমঝোতা স্মারক ও চুক্তি এবং সাতটি প্রকল্প ঘোষণাপত্র সই করেছে বাংলাদেশ ও চীন। এর মধ্যে দুটি সমঝোতা স্মারক নবায়ন করা হয়েছে। এগুলো হলো :

১. ডিজিটাল অর্থনীতিতে বিনিয়োগ সহায়তা শক্তিশালী করতে সমঝোতা স্মারক।

২. ব্যাংকিং এবং ইন্স্যুরেন্স নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে চায়না ন্যাশনাল ফাইন্যান্সিয়াল রেগুলেটরি অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এনএফআরএ) এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যে সমঝোতা স্মারক।

৩. বাংলাদেশ থেকে চীনে তাজা আম রপ্তানির জন্য উদ্ভিদস্বাস্থ্য সম্পর্কিত (ফাইটোস্যানিটারি) উপকরণ বিষয়ে একটি প্রটোকল।

৪. অর্থনৈতিক উন্নয়ন নীতি সহায়তা ক্ষেত্রে সমঝোতা স্মারক।

৫. বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ সহায়তা বিষয়ক সমঝোতা স্মারক।

৬. ডিজিটাল অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারে সমঝোতা স্মারক।

৭. বাংলাদেশে প্রকল্পে চায়না-এইড ন্যাশনাল ইমারজেন্সি অপারেশন সেন্টারের ‘ফিজিবিলিটি স্টাডি’ বিষয়ে কার্যবিবরণী সই।

৮. চীনের সহায়তায় ষষ্ঠ বাংলাদেশ-চায়না মৈত্রী সেতু সংস্কার প্রকল্পের চিঠি বিনিময়।

৯. নাটেশ্বর আর্কিওলজিকাল সাইট পার্ক প্রকল্পে চায়না-এইড কনস্ট্রাকশনের ফিজিবিলিটি স্টাডি বিষয়ে চিঠি বিনিময়।

১০. চীনের সহায়তায় নবম বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু প্রকল্প বিষয়ে চিঠি বিনিময়।

১১. মেডিকেল সেবা এবং জনস্বাস্থ্য বিষয়ে সহযোগিতা শক্তিশালী করতে একটি সমঝোতা স্মারক।

১২. অবকাঠামোগত সহযোগিতা জোরদারে একটি সমঝোতা স্মারক।

১৩. গ্রিন অ্যান্ড লো-কার্বন উন্নয়ন বিষয়ে সহযোগিতা বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক।

১৪. বন্যার মৌসুমে ইয়ালুজাংবু (ব্রহ্মপুত্র) নদের হাইড্রোলজিক্যাল তথ্য বাংলাদেশকে দেওয়ার বিধি বিষয়ক সমঝোতা স্মারক নবায়ন।

১৫. চীনের জাতীয় রেডিও এবং টেলিভিশনের সঙ্গে বাংলাদেশের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের একটি সমঝোতা স্মারক।

১৬. পারস্পরিক সহযোগিতা বিষয়ক চীনের মিডিয়া গ্রুপের (সিএমজি) বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সমঝোতা স্মারক।

১৭. চীনের মিডিয়া গ্রুপের (সিএমজি) সঙ্গে বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) সমঝোতা স্মারক।

১৮. সিনহুয়া নিউজ এজেন্সি ও বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) মধ্যে সমঝোতা স্মারক।

১৯. সিনহুয়া নিউজ এজেন্সি ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) মধ্যে সমঝোতা স্মারক।

২০. চীনের শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমঝাতা স্মারক নবায়ন।

২১. টেকসই অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক।

২২. চীনের শ্যানডং অ্যাগ্রিকালচারাল ইউনিভার্সিটির সঙ্গে গাজীপুরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমঝোতা স্মারক।

বৈঠকে যে সাত ঘোষণাপত্র স্বাক্ষর হয় সেগুলো হলো :

১. চীন-বাংলাদেশ মুক্তবাণিজ্য চুক্তি বিষয়ে যৌথ ফিজিবিলিটি স্টাডির সমাপ্তি ঘোষণা।

২. চীন-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ বৃদ্ধি চুক্তির আলোচনা শুরুর ঘোষণা।

৩. ডিজিটাল কানেকটিভিটি প্রকল্পের জন্য টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক আধুনিকায়ন সমাপ্তি ঘোষণা।

৪. ডাবল পাইপলাইনের মাধ্যমে সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিংয়ের ট্রায়াল শেষ করার ঘোষণা।

৫. রাজশাহী ওয়াসা সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট শুরুর ঘোষণা।

৬. শানদং কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক।

৭. বাংলাদেশে লুবান ওয়ার্কশপ নির্মাণের ঘোষণা।

18
Spread the love


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর