• বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই ২০২৪, ০২:১৬ পূর্বাহ্ন

রেমালের ধাক্কা কাটিয়ে উঠছে সুন্দরবন

Kolomer Batra / ১২ বার পড়া হয়েছে।
সময় কাল : শনিবার, ২৯ জুন, ২০২৪

দীর্ঘদিনের দাবদাহ ও ঘূর্ণিঝড় রেমালের উচ্চ জলোচ্ছ্বাসে লবণ পানিতে প্লাবিত হওয়ার পর মধ্য আষাঢ়ে বৃষ্টির ফোঁটা পেয়ে সুন্দরবন প্রাণ প্রাচুর্যে ভরে উঠতে শুরু করেছে। সজীব হয়ে উঠছে সুন্দরবনের গাছপালা ও তরুলতা। পর্যটকদের আগমন বন্ধ থাকায় সুনসান নীরবতায় এখন শান্ত, স্নিগ্ধ, নিরিবিলি—এ এক অন্যরকম সুন্দরবন। যা সুন্দরবনের মাছ ও বন্যপ্রাণীর বংশবৃদ্ধি, অবাধ বিচরণ, প্রজনন কার্যক্রম এবং নতুন উদ্ভিদের অঙ্কুরোদগমের জন্য অনুকূল পরিবেশ।

সুন্দরবনের অতুলনীয় প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য সবসময়ই মানুষের কাছে আকর্ষণীয়। পৃথিবীর বৃহত্তম বদ্বীপ, বিস্তৃত ম্যানগ্রোভ অরণ্য, নদী, উপনদী ও শাখানদীর জটিল জাল—সবমিলিয়ে সুন্দরবন এক অপরিসীম রহস্য। এ কারণে পর্যটকেরা বারবার ফিরে আসে বাঘ-হরিণের রাজ্য সুন্দরবনে। ফলে এই বন সব সময় নানাভাবে দূষণের শিকার হয়। যার মারাত্মক বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়ে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের ওপর।

সর্বশেষ গত ২৬ মে ভোরে ঘূর্ণিঝড় রেমাল আঘাত হানে বঙ্গোপসাগরসংলগ্ন সুন্দরবনে। এ সময় বঙ্গবন্ধুরচর, পুটনিরচরসহ বঙ্গোপসাগরসংলগ্ন সুন্দরবনে সর্বোচ্চ ২০ ফুট পর্যন্ত জলোচ্ছ্বাস হয়। বন বিভাগ সূত্র জানায়, সুন্দরবনের যে সব জায়গা সবচেয়ে উঁচু তা সর্বোচ্চ আট ফুট। অথচ রেমালের সময় জলোচ্ছ্বাসে সেখানে পানি ওঠে ১০-১২ ফুট। টানা ৩৬-৩৭ ঘণ্টা শতাধিক মিষ্টি পানির পুকুরসহ  পুরো সুন্দরবন লবণ পানির নিচে ছিল। এর আগে এ রকম জলোচ্ছ্বাস সুন্দরবনে কখনো হয়নি। যা ছিল সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকি স্বরূপ।

এদিকে সুন্দরবনের নদীখালের মাছ, বনে প্রাণীদের অবাধ বিচরণ ও প্রজনন এবং উদ্ভিদের অঙ্কুরোধগম কার্যক্রম সুরক্ষার জন্য প্রতি বছরের মতো এ বছরও ১ জুন থেকে আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত-টানা তিন মাসের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে সুন্দরবনের দুয়ার। এ সময় পর্যন্ত (বর্ষাকাল) পর্যটকদের প্রবেশ, নৌযানসহ জেলে-মৌয়ালদের চলাচল এবং সুন্দরবনের নদী-খালে মাছ ধরা নিষিদ্ধ করা হয়। এই নিষেধাজ্ঞা মেনে ১ জুনের আগেই গহিন সুন্দরবন থেকে লোকালয়ে ফিরে গেছেন উপকূলীয় অঞ্চলের জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়ালরা।

সূত্রমতে, সুন্দরবন নানা ধরনের প্রাণবৈচিত্র্যে অনন্য। বেঙ্গল টাইগারের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল সুন্দরবন। এই বনে প্রায় ২৮৯ প্রজাতির স্থলজ প্রাণী বাস করে। এছাড়া আছে প্রায় ৪২ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৩৫ প্রজাতির সরীসৃপ, ৮ প্রজাতির উভচর এবং বিভিন্ন প্রজাতির মাছসহ ২১৯ প্রজাতির জলজ প্রাণী। সুন্দরবনে আরো আছে ৩৫০ প্রজাতির পাখি। তাছাড়া সুন্দরবনের কীটপতঙ্গের বৈচিত্র্যও সীমাহীন।

বন বিভাগ সূত্র জানায়, জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত তিন মাস সুন্দরবনের অধিকাংশ বন্যপ্রাণী ও মাছের প্রজনন এবং গাছের অঙ্কুরোধগম হয়, গাছের চারা গছায়।  ফলে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের উদ্দেশে এই সময়ে মানুষের চলাচলে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যাতে এই সময় সুন্দরবনের মাছ ও বন্যপ্রাণীরা  অবাধে বিচরণ করতে পারে; তাদের প্রজনন এবং গাছের অঙ্কুরোধগম বাধাগস্ত না হয়। ইতিমধ্যে এই নিষেধাজ্ঞার সুফলও মিলেছে।

সুন্দরবনসংলগ্ন দাকোপ উপজেলার ছুতারখালী ইউনিয়নের কালাবগি গ্রামের জেলে সালাম মোল্লা বলেন, সুন্দরবনের নদী-খালে তিন মাসের জন্য মাছ ধরা বন্ধ থাকায় আমাদের মতো জেলেদের অনেক কষ্ট হচ্ছে। এই সময় অন্য কাজ করছি। এই নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পর আমরা নদী-খাল থেকে আরো বেশি মাছ ধরতে পারব।

কয়রা উপজেলার কয়রা সদর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য নাজমুল সরদার বলেন, তিন মাস সুন্দরবনে পর্যটক ও জেলে-বাওয়ালিদের যাওয়া বন্ধ থাকার কারণে বন্যপ্রাণীরা অবাধে চলাচল করতে পারছে।

সুন্দরবন বন বিভাগের সংরক্ষক (সিএফ) মিহির কুমার দো বলেন, জুন থেকে আগস্ট (বর্ষাকাল) পর্যন্ত সুন্দরবনের নদী-খালের মাছ এবং বন্য প্রাণীদের অবাধ বিচরণ ও প্রজননকাল। এছাড়া এই সময় সুন্দরবনের উদ্ভিদের অঙ্কুরোধগম ও চারা গজানোর সময়। ফলে সুন্দরবন ও সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের উদ্দেশে এই তিন মাসকে সবার প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে এই নিষেধাজ্ঞার ইতিবাচক ফলাফলও পাওয়া গেছে। তিনি আরো বলেন, আমরা আশা করছি, দুই-এক দিনের মধ্যে মুষলধারে বৃষ্টিপাত শুরু হলে সুন্দরবনের পুকুরগুলো মিষ্টি পানিতে ভরে যাবে। ফলে বন্যপ্রাণীদের খাওয়ার পানির সংকটও কেটে যাবে।

5
Spread the love


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর