সাফল্যের সুতোয় স্বপ্ন বুনে বিশ্বজয়ের পথে উইন্ডি গ্রুপ
নিজস্ব প্রতিবেদক : একটি ছোট্ট দুই লাইনের কারখানা থেকে ২৫ বছরের পথচলায় একটি বৃহৎ পোশাকশিল্প গ্রুপ। পেছনে রয়েছে কঠোর পরিশ্রম, অদম্য সাহস, দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার এক গল্প। সেই গল্পের কেন্দ্রবিন্দু—উইন্ডি গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক জনাব মেজবাহ উদ্দিন খান।
সমুদ্রের নীল জলরাশি, আকাশজুড়ে মেঘের খেলা আর কর্মীদের উচ্ছ্বাস-কক্সবাজারে যেন সাফল্যেরই উৎসব। প্রতি বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও কর্মীদের নিয়ে বনভোজনের আয়োজন করে উইন্ডি এ্যাপারেলস্ লিঃ। ১১ আগস্ট থেকে ১৪ আগস্ট কক্সবাজারের কক্স টুডে হোটেলে আয়োজিত তিন রাত দুই দিনের এই উৎসবে ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, দেশ-বিদেশের শিল্পীদের পরিবেশনা, ডিজে শো, নৃত্য, ব্র্যান্ড শো ও নানা ধরনের খেলাধুলা।
ফুটবল থেকে হাড়িভাঙা, বালিশ খেলা থেকে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা-প্রতিটি আয়োজনেই ছিল কর্মীদের প্রাণবন্ত অংশগ্রহণ। বিনোদনের পাশাপাশি এই আয়োজন হয়ে ওঠে প্রতিষ্ঠান ও কর্মীদের মধ্যকার সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করার এক অনন্য উপলক্ষ।
কারণ উইন্ডি গ্রুপের কাছে সাফল্য শুধু ব্যবসায়িক পরিসংখ্যান নয়; সাফল্যের সবচেয়ে বড় অংশীদার তার কর্মীরা।
আজকের উইন্ডি গ্রুপের এই অবস্থান একদিনে তৈরি হয়নি।
১৯৯৯ সালে জনাব মেজবাহ উদ্দিন খান যখন উইন্ডি এ্যাপারেলস্ লিঃ প্রতিষ্ঠা করেন, তখন সেটি ছিল মাত্র একটি ছোট্ট দুই লাইনের কারখানা। গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারিং ব্যবসায় তাঁর পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল সীমিত,ফলে শুরুটা ছিল সুযোগের চেয়ে চ্যালেঞ্জে ভরা।
কিন্তু তিনি চ্যালেঞ্জ থেকে পিছিয়ে যাননি।
একটি শিপমেন্ট সময়মতো দিতে কারখানায় টানা ৭২ ঘণ্টা কাজ করা কিংবা মাত্র এক লাখ টাকার প্রয়োজন মেটাতে সারাদিন ব্যাংকে অপেক্ষা করা-তাঁর উদ্যোক্তা জীবনের শুরুর সময়ের এমন অনেক অভিজ্ঞতা আজকের সাফল্যের ভিত তৈরি করেছে।
তাঁর দর্শন ছিল পরিষ্কার-টাকার পেছনে নয়, কাজের পেছনে ছুটতে হবে।
সেই কঠোর পরিশ্রম, ধৈর্য এবং নিরলস প্রচেষ্টাই ধীরে ধীরে ছোট্ট কারখানাটিকে একটি বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীতে রূপান্তরিত করেছে।
মেজবাহ উদ্দিন খানের শিক্ষাজীবনের শুরু ছাইতকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এরপর আর.এম. হাট কে উচ্চ বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। পরবর্তীতে ঢাকায় এসে মতিঝিল আইডিয়াল হাই স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হন।
উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেন ঢাকা সিটি কলেজ থেকে।
কর্মজীবনের পাশাপাশি তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগে পড়াশোনা করেন এবং ১৯৯০ সালে স্নাতক ও ১৯৯১ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবনকে একই সঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার এই অধ্যায় তাঁর অধ্যবসায় ও আত্মনির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।
আট ভাই-বোনের মধ্যে ষষ্ঠ মেজবাহ উদ্দিন খান। বড় ভাই শরীফ উদ্দিন খান মিসমাহ ফ্যাশন লিমিটেডের কর্ণধার এবং মেঝো ভাই রফিক উদ্দিন খান তাসফিয়া ট্রেড লিংকের কর্ণধার।
১৯৯৯ সালে ফারিনা খানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন মেজবাহ উদ্দিন খান। একই বছর শুরু হয় উইন্ডি গ্রুপের যাত্রা। ২০২৪ সালে ব্যবসায়িক জীবনের ২৫ বছর পূর্তির পাশাপাশি তাঁরা উদযাপন করেন দাম্পত্য জীবনেরও ২৫ বছর।
ফারিনা খান বর্তমানে উইন্ডি গ্রুপের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত, নেতৃত্ব ও প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক অগ্রযাত্রায় তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
তাঁদের তিন সন্তান-কন্যা জুনাইনা খান এবং দুই পুত্র জুনাইন খান ও জুহাইন খান।
জুনাইনা খান যুক্তরাষ্ট্রের Arizona State University থেকে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করে বর্তমানে উইন্ডি গ্রুপের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে পরামর্শ ও কার্যক্রমে সম্পৃক্ত থাকার পাশাপাশি নারীর ক্ষমতায়ন এবং কর্মসংস্থানের মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে কাজ করছেন।
মেজবাহ উদ্দিন খানের কাছে পরিবার শুধু ব্যক্তিগত জীবনের অংশ নয়; এটি তাঁর শক্তি, প্রেরণা এবং এগিয়ে যাওয়ার অন্যতম ভিত্তি।
২৫ বছরের ব্যবধানে উইন্ডি গ্রুপের যাত্রা বিস্তৃত হয়েছে বহু প্রতিষ্ঠানে।
উইন্ডি এ্যাপারেলস্ লিঃ, তানাজ ফ্যাশন্স লিমিটেড, হলিউড গার্মেন্টস (প্রা.) লিমিটেড, ভিনটেজ গার্মেন্টস (প্রা.) লিমিটেড, ইউনিয়ন স্পোর্টসওয়্যার লিমিটেড, উইন্ডি ওয়াশিং প্লান্ট, উইন্ডি লন্ড্রি লিমিটেড, উইন্ডি ওয়েট অ্যান্ড ড্রাই প্রসেস লিমিটেড, কে সি ওয়াশিং প্লান্ট এবং উইন্ডি লজিস্টিকস লিমিটেড সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গ্রুপটি তৈরি পোশাকশিল্পে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে।
প্রতিষ্ঠানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে উইন্ডি গ্রুপ প্রায় ১৬ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং প্রায় ২৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের রপ্তানি বাজার গড়ে তুলেছে।
লক্ষ্য আরও বড় ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের ব্যবসায়িক পরিসর তৈরি করা এবং ২৫ থেকে ৩০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা।
উইন্ডি গ্রুপের দীর্ঘ পথচলায় এসেছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি।
২০২১-২২ অর্থবছরে জাতীয় রপ্তানিতে স্বর্ণপদক অর্জন করেছে উইন্ডি এ্যাপারেলস্ লিঃ প্রতিষ্ঠানটি পরিবেশবান্ধব অবকাঠামোর জন্য USGBC থেকে গোল্ড ক্যাটাগরির LEED সনদ অর্জন করেছে।
এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে বিভিন্ন নামকরা ক্রেতা ও ব্র্যান্ডের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে প্রতিষ্ঠানটি। ID KIDS থেকে Best Supplier (Woven) এবং H&M থেকে Gold Supplier হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার দাবিও প্রতিষ্ঠানটির সাফল্যের তালিকায় রয়েছে।
জনাব মেজবাহ উদ্দিন খান বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে একাধিকবার C.I.P মর্যাদা পেয়েছেন এবং BGMEA-এর Director হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
এসব অর্জন শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের স্বীকৃতি নয়; বরং বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে দীর্ঘমেয়াদি কাজের একটি প্রতিফলন।
মেজবাহ উদ্দিন খানের নেতৃত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য-মানুষকে প্রতিষ্ঠানের মূল শক্তি হিসেবে দেখা।
তিনি মনে করেন, একটি প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য শুধু আধুনিক প্রযুক্তি, বিনিয়োগ কিংবা ব্যবসায়িক কৌশলের ওপর নির্ভর করে না; দক্ষ ও মূল্যায়িত কর্মীই একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত সম্পদ।
তাঁর নেতৃত্বে কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ, কর্মপরিবেশ এবং কল্যাণকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা তুলে ধরে উইন্ডি গ্রুপ।
সামাজিক ও পরিবেশগত দায়বদ্ধতাকেও তিনি ব্যবসার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করেন। পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, টেকসই উৎপাদন ব্যবস্থা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে একটি দায়িত্বশীল শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলাই তাঁর অন্যতম লক্ষ্য।
ব্যবসায়িক যাত্রায় সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগুলোর একটি ছিল কোভিড-১৯ মহামারি।
যখন বৈশ্বিক অর্থনীতি বিপর্যস্ত, তৈরি পোশাকশিল্পও কঠিন সময় পার করছে, তখনও উইন্ডি গ্রুপ তার কার্যক্রম ধরে রাখার চেষ্টা করে।
উইন্ডি গ্রুপের সিওও মো. ইসরাফিল তালুকদার বলেন।
আমরা কাজকে ভালোবাসি। কাজের স্বার্থে কখনো কারও সঙ্গে কম্প্রোমাইজ করি না।
এই কর্মদর্শনই প্রতিষ্ঠানের সাংগঠনিক সংস্কৃতির অন্যতম ভিত্তি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
মেজবাহ উদ্দিন খানের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা শুধু উইন্ডি গ্রুপের পরিধি বাড়ানোয় সীমাবদ্ধ নয়।
তাঁর লক্ষ্য বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের একটি শক্তিশালী পোশাক ব্র্যান্ড হিসেবে উইন্ডি গ্রুপকে প্রতিষ্ঠিত করা, কর্মসংস্থান বাড়ানো, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং পরিবেশবান্ধব শিল্পব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাওয়া।
আমরা কোভিডের মতো মহাশক্তিশালী সংকটকে অতিক্রম করে সাফল্যের এই চূড়ান্তে পৌঁছেছি। আগামী ৫ বছরের মধ্যে আরও ১০হাজার কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে চাই। আর বহির্বিশ্বের বুকে বাংলাদেশের উইন্ডি গ্রুপকে চিরস্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই—ইনশাআল্লাহ।
এই বক্তব্যে যেমন রয়েছে উচ্চাকাঙ্ক্ষা, তেমনি রয়েছে দেশের মানুষের জন্য বড় পরিসরে কাজ করার প্রত্যয়।
ব্যবসায়ী পরিচয়ের বাইরে মেজবাহ উদ্দিন খানকে ঘিরে রয়েছে আরেকটি পরিচয়—একজন পরিবারপ্রিয়, মৃদুভাষী ও সামাজিকভাবে সম্পৃক্ত মানুষ।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানো, বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যক্তিগত খোঁজখবর নেওয়াকে তিনি গুরুত্ব দেন।
সামাজিক ও ধর্মীয় বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রেও তাঁর সম্পৃক্ততার কথা তুলে ধরা হয়।
তাঁর কাছে প্রতিষ্ঠানের কর্মীরাও শুধু কর্মী নন—একটি বৃহৎ পরিবারের অংশ।
২৫ বছরের সাফল্য একটি মাইলফলক; কিন্তু মেজবাহ উদ্দিন খানের কাছে এটি কোনো শেষ গন্তব্য নয়।
আগামী দিনের উইন্ডি গ্রুপকে তিনি দেখতে চান আরও আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর, পরিবেশবান্ধব এবং আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক একটি শিল্পগোষ্ঠী হিসেবে।
নতুন বাজার সৃষ্টি, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার—সব মিলিয়ে সামনে রয়েছে আরও বড় পরিকল্পনা।
একটি ছোট্ট দুই লাইনের কারখানা থেকে শুরু।
তারপর একের পর এক চ্যালেঞ্জ।
কখনো ৭২ ঘণ্টার নির্ঘুম শ্রম, কখনো অল্প অর্থের জন্য ব্যাংকে অপেক্ষা, কখনো বৈশ্বিক মহামারির কঠিন বাস্তবতা—সবকিছুকে পেছনে ফেলে এগিয়ে চলা।
আজ সেই পথচলার সঙ্গে যুক্ত হাজারো কর্মী, আন্তর্জাতিক বাজার, একাধিক প্রতিষ্ঠান এবং বড় স্বপ্ন।
মেজবাহ উদ্দিন খানের গল্প তাই শুধু একজন উদ্যোক্তার গল্প নয়; এটি স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার গল্প। এটি পরিশ্রমের গল্প। এটি নেতৃত্বের গল্প। আর সবচেয়ে বড় কথা—এটি মানুষকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার গল্প।
কক্সবাজারের নীল আকাশের নিচে কর্মীদের এই আনন্দ যেন সেই গল্পেরই আরেকটি অধ্যায়।
সুতো থেকে পোশাক। পোশাক থেকে বিশ্ববাজার।
আর কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন।
সুতোয় সুতোয় স্বপ্ন বুনে, গুণগত মানে ভরসা জাগিয়ে—
উইন্ডি গ্রুপ এগিয়ে যেতে চায় আরও বহুদূর।
সাফল্যের সুতোয় বোনা এই যাত্রার পরবর্তী গন্তব্য—বিশ্বমঞ্চ।







