একমাত্র ডাঃ ৩ মাসের ছুটিতে লালমনিরহাট পরিবার পরিকল্পনা তিন উপজেলার চিকিৎসা সেবা বঞ্চিত হাজারো মানুষ
আশরাফুল হক, লালমনিরহাট : লালমনিরহাটের পরিবার পরিকল্পনা তিন উপজেলার একমাত্র ডাক্তার রাশেদ মেনন। তাও আছেন একটানা তিন মাসের ছুটিতে। ফলে তিন উপজেলার প্রায় ১০ লাখ মানুষের মাঝে হাজারো দম্পতি চরমভাবে চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
জানা গেছে, লালমনিরহাট সদর সহ আদিতমারী, কালীগঞ্জ, হাতীবান্ধা ও পাটগ্রাম মিলে পাঁচটি উপজেলা রয়েছে। তারমধ্যে লালমনিরহাট ১০ শয্যাবিশিষ্ট মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র, আদিতমারী, কালীগঞ্জ উপজেলা পরিবার পরিকল্পনার দায়িত্বে একমাত্র মেডিকেল অফিসার ডাঃ রাশেদ মেনন (এমসিএইচ-এফপি)। পরিবার পরিকল্পনার আওতাধীন তিন উপজেলার প্রায় ১০ লাখ মানুষের বসবাস।
এসব মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতে ডাক্তার সংকট থাকার পরেও চলতি বছরের (১ এপ্রিল থেকে আগামী ৩০ জুন) পর্যন্ত মেডিকেল অফিসার ডাঃ রাশেদ মেনন পারিবারিক অসুবিধা দেখিয়ে একটানা তিন মাসের ছুটি লালমনিরহাট পরিবার পরিকল্পনার উপপরিচালক (অঃদাঃ) মোজাম্মেল হক মঞ্জুর করেন। তবে মেডিকেল অফিসারের বদলে নিয়মবর্হিভূতভাবে দু’জন নন মেডিকেলকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। যার স্মারক নং-৫৯.১১.৫২০০.০০০.১৮. ০০৩. ২৬.১২৩/১(৯), তাং ২৫-০৩-২৬।
এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জারি করা এক অফিস আদেশে বলা হয়, স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সর্বস্তরের চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি (অর্জিত ছুটি ও নৈমিত্তিক ছুটি) এতদ্বারা স্থগিত/বাতিল করা হলো। আপৎকালীন সময়ে নিরবচ্ছিন্ন চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা এবং হামের টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করতেই ছুটি স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আদেশকে অমান্য করে ডাঃ রাশেদ মেননের ছুটি এখনো স্থগিত করেনি লালমনিরহাট পরিবার পরিকল্পনার উপপরিচালক (অঃদাঃ) মোজাম্মেল হক।
লালমনিরহাট উপজেলা পরিবার পরিকল্পনার অফিস সুত্র জানা গেছে, আগে প্রতিদিন গড়ে ৫০ জন রোগী আসতেন। এখন সে সংখ্যা নেমে এসেছে ১০-১৫ জনে। চিকিৎসাসেবা না পেয়ে অনেকে ক্ষিপ্ত হয়ে বাড়িতে ফিরত যাচ্ছেন। কারণ মেডিকেল অফিসার নেই। ডাঃ রাশেদ মেনন একটানা তিন মাসের ছুটি নিয়ে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নাক, কান ও গলা (ডিএলও) কোর্স করছেন।
তার পরির্বতে মেডিকেল অফিসারের যারা দায়িত্বে আছেন, তারা ঠিকমত দায়িত্ব পালন করছেন না। তাছাড়াও তারা নন মেডিকেল। ফলে বর্তমানে তিন উপজেলার নারী ও পুরুষের জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি, খাবার বড়ির প্রকার, মাত্রা, কনডমের কার্যপদ্ধতি, ইনজেকশন, আই ইউ ডি বা কপার টির, সিজার, পুরুষ-নারী বন্ধ্যাকরণ-টিউবেকটমি/লাইগেশন মত কাঙ্খিত সেবা মিলছে না। ফলে গর্ভবতী মা ও কিশোরী সহ তিন উপজেলার প্রায় ১০ লাখ মানুষের মাঝে হাজারো দম্পতি চরমভাবে চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ফলে বাড়ছে অনিয়ন্ত্রিত গর্ভধারণ ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির শঙ্কা।
লালমনিরহাট শহরের ভ্যানচালক স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা খাদিজা খানম বলেন, আমার সন্তান প্রসবের তারিখ হয়েছে। এ জন্য মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে ডাক্তারের কাছে আসছি, কিন্তু দেখা পাচ্ছি না। আসলি আমাগের মতো গরিব মানুষ এট্টু উপকার হত। যদি এখানে নিয়মিত ডাক্তার বসত। বেশকিছু ধরে এই মাতৃমঙ্গলে আসছি আর ফিরত যাচ্ছি।
আদিতমারী উপজেলা পরিবার পরিকল্পনার চিকিৎসা নিতে আসা রহিমা খাতুন বলেন, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রতিদিনই রোগী আসেন। এর মধ্যে নারী রোগীই বেশি। পুরুষ রোগীরাও আসেন সাধারণ চিকিৎসা নিতে। এছাড়া শিশু ও অন্তঃসত্ত্বা নারীকে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয় বেশি। এখানে দীঘদিন ধরে ডাক্তার নেই, তাই বাড়িতে ফিরত যাচ্ছি।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আপৎকালীন সময়ে নিরবচ্ছিন্ন চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সর্বস্তরের চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি (অর্জিত ছুটি ও নৈমিত্তিক ছুটি) এতদ্বারা স্থগিত/বাতিল করা হয়েছে। তার পরেও ডা. রাশেদ মেনন ছুটি নিয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের উদ্দেশ্যে সময় ব্যয় করছেন। তার কোর্সে যাবার অনুমতি দিবেন মন্ত্রণালয়, উপপরিচালক নয়। সরকারি কাজে ব্যাঘাত হয়, জনবল সংকট থাকলে এরূপ ক্ষেত্রে উপপরিচালক এতো লম্বা অর্জিত ছুটি মঞ্জুর করতে পারে না। মন্ত্রণালয়কে বৃদ্ধা আঙ্গুল দেখিয়ে গোপনে অনৈতিক সুবিধা গ্রহণের মাধ্যমে স্বেচ্ছাচারিতার কাজ করেছেন। তবে স্বাস্থ্য বিধিমতে, সাধারণত কর্তৃপক্ষের বিশেষ আদেশে ছুটি বাতিল বা স্থগিত হতে পারে।
এ বিষয়ে মেডিকেল অফিসার (এমসিএইচ-এফপি) ডাঃ রাশেদ মেনন বলেন, “আমি কি কারণে ছুটি নিয়েছি, আপনাকে বলতে বাধ্য নই। আমার অফিস জানেন”।
এ ব্যাপারে লালমনিরহাট পরিবার পরিকল্পনার উপপরিচালক (অঃদাঃ) মোজাম্মল হক বলেন, “বিধি মোতাবেক ডাঃ রাশেদ মেনন ছুটি পান। ছুটি তার অধিকার। তাই তাকে তিন মাসের ছুটি দেওয়া হয়েছে। ছুটি নিয়ে কোর্স করুক বা না করুক সেটা দেখার দায়িত্ব আমার নয়।







